বিপ্রতীপ বৃষ্টি

ড্রেন থেকে বেয়ে উপরে উঠে ইঁদুরটা। কয়েকটা চিকা ভাগারের থেকে খাচ্ছে। ভিজে চুপসে হয়ে আছে ও। ধূসর বিড়ালটার হাত থেকে কোনমতে বেঁচে ফিরেছে। যদিও থাবার আঁচড় থেকে বাঁচতে পারেনি। শরীরের পেছন দিকটা কেটে গেছে নখের আঁচড়ে। চামচিকার উড়াউড়ি আর চিকার কারনে এ যাত্রা বেঁচে ফিরেছে। পেছনটা কেটে রক্ত ঝড়ছে। বৃষ্টিতে ড্রেনের পানি উপচে ওঠায় প্রবল স্রোতে ভেসে যায়নি ভাগ্যিস। বাসা পানিতে ডুবে গেছে। চিকাগুলোর ভাব তেমন সুবিধার মনে হচ্ছে না। বিড়ালটাকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। ঠান্ডা আর জ্বালাপোড়ায় বিপর্যস্ত। ভাবছে পানির পাইপ বেয়ে বুড়ো লোকটার রুমে যাবে। ওটা নিরাপদ আশ্রয়। চৌকির নীচে অযত্ন-অবহেলায় থাকা বুড়োর ছেড়া অব্যবহৃত কম্বলটা আশ্রয়ের একমাত্র স্থান। কোনমতে উপরে উঠে আসে ও। থেমেথেমে বৃষ্টি হচ্ছে এখনো। বুড়ো বসে আছে দরজায় চেয়ার পেতে। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। কেমন আনমনে চেয়ে থাকে অপলক; নড়াচড়া নেই। মাঝেমাঝে মনে হয় মরে গেছে। রুমের ভেতরে গেলে জানালার ফাঁক গলে যেতে হবে। বিড়ালটা ঘুমাচ্ছে ওপাশের ট্যাংকির নীচে; বড্ড ভয়ানক হারামি শালার বেটা। একবার নাগলে পেলে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিবে। বিড়ালটার ঘুম বড় একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না; ভান ধরে থাকে অনেক সময়। বৃষ্টিতে এদিকে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। এই ভরসায় সন্তর্পণে খানিক্ষন দেখে নেয় আশপাশ। অবশেষে বুড়োর চোখ ফাঁকি দিয়ে জানালার ফাঁক গলে চলে আসে কম্বলের ভেতর। 


মশরুরর সাহেব একজন অধ্যাপক। বিপত্নীক হবার পর থেকে চিলেকোঠায় থাকেন। ষাটোর্ধ প্রবীণ মানুষ। কলেজের চত্ত্বরটা দেখা যায় জানালা থেকে। কলেজ কাছে হবার সুবাদে থাকা। ছেলেমেয়ে সব বিদেশে স্থায়ী হয়েছে। দেশে যারা আছে তাদের সাথে যোগাযোগ তেমন আর নেই। চাকরির সুবাদে মাঝে মাঝে যোগাযোগ হয়। কলেজ শেষে জানালা অথবা দরজার সামনে চেয়ার পেতে বসে থাকেন আনমনে। কখনো একটা বই বা পত্রিকা থাকে সঙ্গী হিসেবে। কখনো পুরোদিনের গান ছেড়ে দিয়ে আকাশ দেখেন অথবা রেইন্ট্রি গাছের পাতার ফাঁক গলে কিছু খোঁজার চেষ্টা করেন। সকালের দিকে একজন বুয়া এসে রান্না করে দিয়ে যায়। সারাদিন কাটান কলেজে। বাকি সময় লেখালেখি আর শুন্য বিকেলকে সঙ্গী করে। রাত নামলে মৃদু আলোয় শুয়ে থাকেন অথবা টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে অধ্যাপনা করেন; টুকিটাকি লিখেন; পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলে দেন বা একটা সিগারেট ধরিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকেন। বিছানায় এলোমেলো বই ছড়ানো-ছিঁটানো থাকে; টেবিলে স্তুপাকারে জমাট বেঁধে থাকে। 

লোকটাকে ইঁদুরটার ভালই মনে হয়। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকেন। মাঝে কলম মেঝেতে পড়ে যাবার শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। সকালে হালকা নাস্তা করে বের হন কলেজে। আসেন ভর দুপুরে। ইদানিং বের হচ্ছেন না। সারাক্ষণ বাসায় পড়ে থাকেন। মাঝেমাঝে ল্যাপটপে পড়ান। সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা হাতে বের হন অধ্যাপক। কলেজ বন্ধ লকডাউনে। করোনায় প্রবীনদের ঝুঁকি প্রবল। মাঠের প্রান্তে এসে দাড়ান। চারিদিক সুনসান নীরবতা; বই হাতে কারো কোলাহল নেই; পূবের ক্যান্টিন লাগোয়া ভবনটি ঠায় দাড়িয়ে আছে। একগুচ্ছ বৃষ্টির শব্দ সবুজ ঘাস থেকে উঠে আসছে। জোহরের আজান হচ্ছে। ভাঙ্গা গলায় মুয়াজ্জিনের বেসুরো আজান যেন হৃদয়ে কিসের আহ্বান জড়ো করছে। ঘাসগুলো দুলে উঠছে বৃষ্টির ফোটার আছড়ে পড়ার সঙ্গে। ঘাসের সবুজাভ মুগ্ধতায় ডুবে যান। তার এই মুহূর্তে ঘাস হতে ইচ্ছে হচ্ছে; ভেজা, আলতো ঘাস। ঘাসের প্রান্তসীমায় ঐতো দেখা যাচ্ছে তার ডিপার্টমেন্টের সাইনবোর্ড। নীলের ওপর সাদা তুলির আচড়ে মোহ ছড়াচ্ছে নামটি। মনে হচ্ছে ওয়ার্ডসওয়ার্থ বৃষ্টি দেখছে জানালা দিয়ে; জীবনানন্দ লিখছে বারান্দায়; নিবিড় ছায়াঘন কৃষ্ণচূড়ার পাদদেশে একরাশ শুণ্যতা। নিজের কলেজটিকে আজ বড় অচেনা মনে হচ্ছে। চোখ বুঝে লম্বা শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেন; শ্বাস প্রলম্বিত হচ্ছে না । কৃষ্ণচূড়া থেকে একটি আধভেজা কাক উড়ে পশ্চিমে বাদামগাছ লাগোয়া অধ্যাপকের জানালায় গিয়ে বসে। 


ইঁদুরটার ক্ষত বেড়েই চলছে; সাথে যন্ত্রনাও। ক্ষুধা তো আর ব্যাথা মানেনা। অবশেষে পাইপ বেয়ে নীচে নেমে আসে করুণ ব্যথাতুর শরীরে। কিঞ্চিৎ বিস্কুট আর রুটির টুকরো সাবার করে সাবধানী চোখে ফিরে আসে রুমে।মশরুর সাহেবের কাশি বাড়ার সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসও ক্ষীণ হয়ে আসে। মেঘ ঘনিয়ে জমাট কালো অন্ধকার; ঠান্ডা বাতাস বইছে; সাথে গুড়ি বৃষ্টির ফোঁটা নেমে আসছে। মেঘের ফাঁক গলে আসছে ধ্রুব আলো। চেয়ারটা নিয়ে দরজায় বসেন । এই প্রকৃতি পরাবস্তব শুন্যতার সৃষ্টি করেছে । শ্বাস-প্রশ্বাস আরো ক্ষীণ হয়ে আসছে তাঁর। মেঘের দিকে তাকান; মেঘের ফাঁক গলে মৃদু আলো বৃষ্টির সঙ্গে আসছে মুখরিত চত্ত্বরে। তিনি দাড়িয়ে আছেন ব্লাকবোর্ডের সামনে; পেছনে সারিসারি বেঞ্চে শিক্ষার্থীরা নিশ্চুপ বসে আছে। ঘোর কেটে গেলে টেবিলের দিকে তাকান। পত্রিকার শিরোনামঃ " মৃত বেড়ে একশত উনিশ। " লেখাটা ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর।

অনেক্ষণ মোবাইলে রিং বেজে চলছে। বুড়োটা বসেই আছে টেবিলে মাথা রেখে। বাইরে বৃষ্টি কমেছে মাত্র। পাইপ বেয়ে ভয়ানক সতর্কতায় নেমে আসে ইঁদুরটা। জনমানবহীন ভুতুরে শহর; কোন মানুষ নেই; দোকানপাট বন্ধ; ক্ষুধা, ব্যাথায় কাতর অবস্থা। কলেজের মাঠে বাদামের সন্ধানে ছুটে। মেঘ ফরকে আবার বৃষ্টি নামে; ঝুম বৃষ্টি। বজ্রপাতের শব্দে লাল পলেস্তারা বেয়ে উপরে উঠতে থাকে ইঁদুরটি। লাল দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে। পলেস্তারা খসে পড়ার শব্দে শালিকেরা ছুটে পালাতে থাকে বৃষ্টির শহরে।

নবদ্বীপ বসাক লেন,
২৯ আষাঢ়, ১৪২৯

কোন মন্তব্য নেই

তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে—

“সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি- এখনো কি ভালোবাসি? সেটা অবসরে ভাববার কথা, অবসর তবু নেই; তবু একদিন হেমন্ত এলে অবসর পাওয়া যাবে এখন শেলফে চার্বাক ফ্রয়...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.